কলকাতাজেলাপ্রসাশনিক খবররাজনৈতিকরাজ্যশিক্ষাসংস্কৃতি

হাওড়ার জলযন্ত্রণা, না বাগেশ্বর বাবার ধর্মকথা?

একটানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত জনজীবন, জলমগ্ন রাস্তা ও দুর্ঘটনার অভিযোগের মধ্যেই লিলুয়ায় তিন দিনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ঘিরে ক্ষোভ

সৈকত দাস, হাওড়া:

একদিকে টানা প্রবল বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত কলকাতা সহ হাওড়ার জনজীবন, অন্যদিকে জলমগ্ন রাস্তা, রাস্তার গর্ত, যানজট, দুর্ঘটনা এবং একাধিক এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা ব্যাহত—এই পরিস্থিতির মধ্যেই লিলুয়ার রেল ময়দানে তিন দিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাগেশ্বর বাবার ধর্মীয় অনুষ্ঠান। আর এই দুই চিত্রের সংঘাতেই প্রশ্ন উঠেছে,–এই মুহূর্তে সাধারণ মানুষের কাছে বেশি জরুরি কোনটি, জলযন্ত্রণা থেকে মুক্তি, নাকি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ?

হাওড়া সহ কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী একাধিক জেলায় টানা বৃষ্টির জেরে গত কয়েকদিনে বহু এলাকার স্বাভাবিক জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত। শহরের একাধিক রাস্তা ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে জল জমে তৈরি হয়েছে দুর্ভোগ। কোথাও হাঁটুসমান জল, কোথাও রাস্তার গর্ত জলের তলায় চলে যাওয়ায় মরন ফাঁদ হয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে যাতায়াত। দিনের ব্যস্ত সময়ে কর্মস্থল, স্কুল-কলেজ, বাজার কিংবা জরুরি কাজে বেরিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

বিশেষ করে হাওড়ার বিভিন্ন এলাকায় জল জমার পাশাপাশি রাস্তার বেহাল দশা নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাস্তার একাধিক অংশে ছোট-বড় গর্ত রয়েছে। বৃষ্টির জল জমে সেই গর্তগুলি চোখে না পড়ায় যানবাহন চালকদের জন্য পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, গর্তে চাকা পড়ে কোথাও টোটো ও অটোরিকশা উল্টে যাচ্ছে, কোথাও আবার মোটরবাইক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে গিয়ে যাত্রীরা আহত হচ্ছেন।

শুধু যানবাহন নয়, জলমগ্ন রাস্তা পার হতে গিয়েও চরম সমস্যায় পড়ছেন পথচারীরা। অনেক ক্ষেত্রেই রাস্তার কোথায় গর্ত, কোথায় খানাখন্দ তা বোঝার উপায় থাকছে না। ফলে সামান্য অসতর্কতাতেই ঘটছে দুর্ঘটনা। কর্মস্থলে যাওয়ার পথে কিংবা কাজ সেরে বাড়ি ফেরার সময় সাধারণ মানুষকে বাড়তি ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ।

এর পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। জল জমা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং যান চলাচলের সমস্যাকে ঘিরে বহু পরিবার কার্যত চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বর্ষার সময় জল ও বিদ্যুতের মতো দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হওয়ায় ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ। জলমগ্ন রাস্তা থেকে দ্রুত জল নামানো, রাস্তার বিপজ্জনক গর্ত চিহ্নিত করে মেরামতি, যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং বিদ্যুৎ পরিষেবা দ্রুত ফিরিয়ে আনার মতো বিষয়গুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহলে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন ছিল। তাঁদের বক্তব্য, দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে জনপ্রতিনিধিদের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সরেজমিনে পরিস্থিতি পরিদর্শন করা এবং দ্রুত সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হওয়াই প্রত্যাশিত।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই লিলুয়ার রেল ময়দানে বাগেশ্বর বাবার ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, যখন হাওড়ার বিভিন্ন এলাকার মানুষ জলযন্ত্রণা, রাস্তার বেহাল অবস্থা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং যাতায়াতের সমস্যায় ভুগছেন, তখন সেই সমস্যার সমাধানে প্রশাসনিক তৎপরতার পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বের আরও সক্রিয় উপস্থিতি প্রত্যাশিত ছিল।

স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান হওয়া নিয়ে তাঁদের আপত্তি নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যখন কার্যত বিপর্যস্ত, তখন জনপ্রতিনিধিদের অগ্রাধিকার কি হওয়া উচিত নয় মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার দ্রুত সমাধান করা?

তাঁদের বক্তব্য, ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আবেগের বিষয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানও মানুষের সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং জনস্বার্থের প্রশ্নটি আলাদা। তাই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের সমস্যার সমাধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলেই তাঁদের দাবি।

জলযন্ত্রণা ও প্রশাসনিক পরিষেবা নিয়ে ক্ষোভের প্রতিফলন দেখা যায় হাওড়ার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। সাধারণ মানুষের একাংশ পথে নেমে বিক্ষোভ দেখান এবং কোথাও কোথাও পথ অবরোধের মতো কর্মসূচিও হয় বলে দাবি।

বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা যখন থমকে যাচ্ছে, তখন সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রশাসনের মাঠে নামা জরুরি। জল জমে থাকার কারণে দোকানপাট, ব্যবসা, কর্মস্থলে যাতায়াত সবকিছুতেই প্রভাব পড়ছে। বহু মানুষ সময়মতো কাজে পৌঁছতে পারছেন না, আবার অনেকে যানবাহন নিয়ে বেরিয়েও মাঝপথে সমস্যায় পড়ছেন।

বিক্ষোভকারীদের প্রশ্ন, রাস্তা থেকে জল না নামা, রাস্তার গর্ত মেরামত না হওয়া এবং বিদ্যুৎ পরিষেবা স্বাভাবিক না হওয়ার মতো সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে সাধারণ মানুষ কীভাবে তাঁদের সংসার চালাবেন? তাঁদের দাবি, শুধু সাময়িক জল সরিয়ে দেওয়া নয়, জল জমার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এবং রাস্তার পরিকাঠামোর স্থায়ী উন্নয়ন প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, তাঁরা কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধ করার দাবি করছেন না। তাঁদের মূল বক্তব্য—মানুষের মৌলিক সমস্যার সমাধানকে যেন উপেক্ষা করা না হয়।

তাঁদের প্রশ্ন, একটি এলাকার মানুষ যদি দিনের পর দিন জলমগ্ন রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে বাধ্য হন, যানবাহন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে, বিদ্যুৎ পরিষেবা ব্যাহত হয় এবং কর্মজীবী মানুষ কর্মস্থলে যেতে সমস্যায় পড়েন, তাহলে সেই পরিস্থিতিতে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের প্রথম দায়িত্ব কী হওয়া উচিত? এই প্রশ্ন থেকেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক , “হাওড়ার জলযন্ত্রণা, না বাগেশ্বর বাবার ধর্মকথা?”

বাসিন্দাদের দাবি, হাওড়ার জল জমার সমস্যা কোনও নতুন বিষয় নয়। বর্ষা এলেই বহু এলাকায় একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হয়। ফলে শুধু বৃষ্টির সময় পাম্প চালিয়ে জল বের করে দেওয়া কিংবা সাময়িকভাবে রাস্তা পরিষ্কার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

নালা-নর্দমার সংস্কার, জল নিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রাস্তার গর্ত দ্রুত মেরামত এবং বর্ষার আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার দাবি উঠছে।

স্থানীয়দের বক্তব্য, হাওড়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চল। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কাজের জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে যাতায়াত করেন। ফলে রাস্তা ও জল নিষ্কাশন ব্যবস্থার সামান্য সমস্যা তৈরি হলেও তার প্রভাব পড়ে বৃহত্তর জনজীবনে।

এখন সাধারণ মানুষের চোখ প্রশাসনের দিকে। বৃষ্টি থামলে জল নামবে এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু প্রতি বর্ষায় একই জায়গায় জল জমবে, রাস্তা ভেঙে যাবে, মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হবেন এবং তারপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হবে ,এই শৃংখল থেকে হাওড়াকে কবে মুক্ত করে আনা হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু তার পাশাপাশি নাগরিকের নিরাপদ চলাচল, বিদ্যুৎ, রাস্তা, জল নিষ্কাশন এবং জীবিকা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের মৌলিক দায়িত্ব। তাই ধর্মীয় অনুষ্ঠান নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি এখন হাওড়াবাসীর মূল দাবি একটাই–জলযন্ত্রণা থেকে স্থায়ী মুক্তি, নিরাপদ রাস্তা এবং স্বাভাবিক নাগরিক পরিষেবা।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকেই যায়, মানুষ যখন জলবন্দি, তখন তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব কার? ধর্মীয় মঞ্চে উপস্থিতি, নাকি জলমগ্ন রাস্তায় মানুষের পাশে প্রশাসনের সক্রিয় উপস্থিতি?

Khabarer Sandhane is a news hub which provides you with comprehensive up-to-date Bengali news coverage from all over West Bengal and India. Get the latest Bengali top stories, Bengali Breaking Stories, Bengali live news ,current affairs news in Bengali,…

Related Posts

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *