জেলাদেশপ্রসাশনিক খবরবাঙালির পুজোভক্তিমূলকরাজ্যশিক্ষাসংস্কৃতি

৬৩০ বছরের ঐতিহ্যের মাহেশের উল্টো রথে জনসমুদ্র, নজিরবিহীন নিরাপত্তায় সম্পন্ন উৎসব

সৈকত দাস, শ্রীরামপুর: 
প্রায় ৬৩০ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী মাহেশের ঐতিহাসিক উল্টো রথযাত্রা উৎসবে এ বছরও ভক্তদের ঢল নামল। ভোর থেকেই মাহেশ ও সংলগ্ন এলাকায় হাজার হাজার পুণ্যার্থীর সমাগমে কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয় গোটা এলাকা। ধর্মীয় আবেগ, ঐতিহ্য ও উৎসবের আবহে মুখর হয়ে ওঠে শ্রীরামপুরের মাহেশ।

উৎসবে উপস্থিত ছিলেন হুগলি জেলার জেলাশাসক শ্রী খুরশিদ আলী কাদরী (IAS), শ্রীরামপুরের বিধায়ক শ্রী দিলীপ সিং এবং চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের পক্ষ থেকে যুগ্ম পুলিশ কমিশনার-সহ একাধিক প্রশাসনিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তাঁদের উপস্থিতিতে উৎসবের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পায়।

উৎসবকে ঘিরে ভক্তদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রশাসন। চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের উদ্যোগে প্রায় ১,৫০০ পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনীর এক কোম্পানি এলাকায় টহল ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে।

আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ব্যবস্থাও ছিল চোখে পড়ার মতো। গোটা মেলা ও রথযাত্রা চত্বরে ড্রোন ক্যামেরা, ওয়াচ টাওয়ার, লক গেট, এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবনের ছাদ থেকে বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়। ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কুইক রেসপন্স টিম, ট্রাফিক পুলিশ এবং সিভিল ডিফেন্স কর্মীরাও সর্বক্ষণ সতর্ক অবস্থায় ছিলেন।

প্রশাসনের দাবি, সুপরিকল্পিত নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ফলে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে মাহেশের ঐতিহাসিক উল্টো রথযাত্রা সম্পন্ন হয়েছে। ভক্তদের সহযোগিতা এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে বাংলার অন্যতম প্রাচীন এই ধর্মীয় উৎসব আবারও সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন আয়োজক ও প্রশাসনিক কর্তারা।

মাহেশের উল্টো রথের ইতিহাস:

মাহেশের উল্টো রথ হল রথযাত্রার সমাপ্তি উৎসব, যা জগন্নাথদেব, বলভদ্র ও সুভদ্রার মাসির বাড়ি (গুণ্ডিচা মন্দির) থেকে মূল মন্দিরে প্রত্যাবর্তনের দিন পালিত হয়। রথযাত্রার প্রায় আট দিন পরে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয় এবং একে “বাহুদা যাত্রা” বা উল্টো রথ বলা হয়।

মাহেশের রথযাত্রার সূচনা হয় ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দে। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী পুরীতে গিয়ে জগন্নাথদেবের দর্শনের সময় দেবতার কাছ থেকে স্বপ্নাদেশ পান। সেই নির্দেশ অনুসারে তিনি হুগলির মাহেশে জগন্নাথদেবের প্রতিষ্ঠা করেন এবং রথযাত্রার প্রচলন করেন। সেই থেকে মাহেশের রথযাত্রা ও উল্টো রথের ঐতিহ্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসছে।

বর্তমানে মাহেশের রথযাত্রা ভারতের অন্যতম প্রাচীন রথযাত্রা হিসেবে পরিচিত। এটি পুরীর জগন্নাথ মন্দির-এর রথযাত্রার পর অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রথোৎসব বলে বিবেচিত হয়।

উল্টো রথের দিন জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রাকে গুণ্ডিচা মন্দির থেকে মূল মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়। হাজার হাজার ভক্ত রথের দড়ি টেনে পুণ্য অর্জনের বিশ্বাসে অংশ নেন। মেলা, কীর্তন, প্রসাদ বিতরণ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উৎসব উদযাপিত হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়।

কেন একে “মাসির বাড়ি” বলা হয়?

“মাসির বাড়ি” নামটি মূলত লোকবিশ্বাস ও ভক্তিমূলক প্রচলন থেকে এসেছে। জগন্নাথদেবকে পরিবারের একজন সদস্যের মতো ভাবা হয়। সেই ভাবধারা থেকেই গুণ্ডিচা মন্দিরে তাঁর এই বার্ষিক সফরকে “মাসির বাড়ি বেড়াতে যাওয়া” বলা হয়।

আরও একটি জনপ্রিয় লোককথা রয়েছে—ফেরার পথে জগন্নাথদেবের রথ আর্ধাশিনী মন্দির-এর সামনে থামে। সেখানে দেবী আর্ধাশিনীকে জগন্নাথদেবের প্রিয় পোড়া পিঠা (পোডা পিঠা) নিবেদন করা হয়। স্থানীয় লোকবিশ্বাসে দেবী আর্ধাশিনীকে জগন্নাথের “মাসি” হিসেবে মানা হয়। এই প্রথা থেকেই “মাসির বাড়ি” নামটি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

Khabarer Sandhane is a news hub which provides you with comprehensive up-to-date Bengali news coverage from all over West Bengal and India. Get the latest Bengali top stories, Bengali Breaking Stories, Bengali live news ,current affairs news in Bengali,…

Related Posts

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *